,

মরতে বসেছে বেতাগীর বেড়েরধন নদী

বেতাগীর বেড়েরধন নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বেকার হচ্ছেন শত শত জেলে

স্বপন কুমার ঢালী ♦
‘নদী মইরা গেলে মোরাও মইরা যামু। যেই নদীতে ত্রিশ হাত পানির তল দিয়া মাছ ধরছি হেই হানে আজ নৌকাও চলতে পারে না। চাষাবাদও অইতেছে না। গাছপালা মইরা যাইতেছে’ কথাগুলো বলেন রিক্সাচালক আফজাল হোসেন (৪০)। বেতাগী-মির্জাগঞ্জ সীমান্তবর্তী বেড়েরধন নদী ভাড়াট হয়ে যাওয়ায় তার এই আক্ষেপ। দুই উপজেলার নদী তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর দুঃখ বেড়েরধন নদী।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার শ্রীমন্ত নদী ও বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার বিষখালী নদীর সংযোগ স্থাপনকারী বেড়েরধন নদীটি প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। এ নদী দিয়ে আগে বড় বড় লঞ্চ চলত। এখন আর তেমন পানি প্রবাহিত হয় না। নদীর প্রস্থ হারিয়ে আস্তে আস্তে চর জেগে পরিণত হয়েছে মরা খালে। বর্ষাকালে কিছুটা পানি থাকলেও শুকনো মৌসুমে এ নদী একেবারে শুকিয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে নদীর দু’পাড়ের লোকজন হাটুঁ সমান পানি ডেঙ্গিয়ে নদীর এপার ওপার যেতে পারে। নদীটি দিন দিন চরে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। আর এ কারণে কৃষিনির্ভর এখানকার জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বেড়েরধন নদীর মাছ ধরে এক সময় শত শত জেলে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তারাও আজ বেকার হয়ে পড়েছে। জেলেরা পেশা পরিবর্তন করে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন। তারা কেহ রিক্সাচালক কিংবা শ্রমিকের কাজ করে মানববেতর জীবন যাপন করছেন।
বেড়েরধন নদীর দু’পাড়ের দক্ষিণ বাসন্ডা, জলিসা, আনোড় জলিসা, কাটাখালী, উত্তর ভোলানাথপুর, হোসনাবাদ, ছোপখালী, ধনমানিক চত্রা, চরছোপখালী, কাউনিয়া, দক্ষিণ করুনা, বদনীখালী, গ্রামর্দ্দন, দক্ষিণ-উত্তর আমড়াগাছিয়া, দেউলী, লেমুয়া, দোকলাখালী, দক্ষিণ কলাগাছিয়া, ডোমরাবাদসহ ১৮টি গ্রামের প্রায় ৭০ হাজার মানুষের জীবনে নেমে এসেছে সীমাহীন দুর্গতি। এখানে ৫০ হাজার জমিতে চাষাবাদ ও সেচকাজ ব্যাহত হচ্ছে। যাতায়াত, মালপত্র পরিবহন, খাবার পানিতেও নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। মাইলের পর মাইলজুড়ে নদীর বুকে জেগে উঠেছে চর। চরের কারণে ছোট গেছে নদীর পরিধি। মানুষ ভাটির সময় এমনকি স্বাভাবিক জোয়াড়ের সময়ও এ পাড় থেকে ও পাড় হেঁটে পাড়ি দেয়। এমনকি দেউলী গ্রাম থেকে উত্তর আমড়াগাছিয়া গ্রাম পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার নদীর অবস্থা সবচেয়ে গুরুতর। এখানে কৃষকরা চরে আবাদ করেন, কেউবা তার জমির সীমানা বাড়াতে ব্যস্ত থাকেন। বেড়েরধন নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় সংস্কারের অভাবে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য। খুলনা, পিরোজপুর, বরগুনা, বামনা, রাজাপুর, ঝালকাঠি, কাঠালিয়া, পটুয়াখলী যাত্রিবাহী লঞ্চ ১০ বছর আগেই চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে মালবাহী ট্রলার ও নৌকা চলাচলে ভোগান্তির আর সীমা নেই। বেতাগী বন্দরের পুরোনো ব্যবসায়ী আলহাজ্ব মোঃ নুরুল ইসলাম জানান, এ নদী দিয়ে লঞ্চ চলত আমরা পটুয়াখালী থেকে মালামাল নিয়ে আসতাম কিন্তু বর্তমানে এ রুটে লঞ্চে মালামাল আনা নেওয়া সম্ভব নয়। দক্ষিণাঞ্চলে বৃহত্তম বাণিজ্যিক কেন্দ্র ঝালকাঠির সঙ্গে মির্জাগঞ্জ, বাউফল, পটুয়াখালী, দশমিনা, গলাচিপা, খেপুপাড়া, আমতলী, তালতলী ও মহিপুরের সঙ্গে ব্যাবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বেড়েরধন নদী অন্যতম যোগাযোগের মাধ্যম ছিল। বেতাগী উপজেলা আওয়ামীলীগের উপদেষ্ঠা আব্দুস সোবাহান বলেন, বেড়েরধন নদী সংস্কার না হওয়ায় এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। মানুষ দারিদ্র থেকে দারিদ্রতর হয়ে পড়েছে।
বেশ কয়েক বছর আগে ডানিডা’র বাস্তবায়নে নদীটির কিছু অংশ সংস্কার করা হলেও বর্তমান অবস্থা সেই একইরূপ। নদীর তীরবর্তী অধিবাসী আব্দুল আজিজ খান, আব্দুল হাশেম হাওলাদার, রহমান মিঞা, আব্দুল খালেক ও ধীরেন্দ্র দেবনাথ সরকারসহ প্রত্যেকেই এই নদী পুনঃ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছেন। বেতাগী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: নজরুল ইসলাম বলেন, বেড়েরধন নদী পুনঃখননের জন্য সংশ্লিষ্ঠদের কাছে এ ধরনের একটি প্রস্তাব শ্রীঘ্রই পেশ করা হবে।

Print Friendly

     এই ক্যাটাগরীর আরো খবর