,

ডাক্তার পরিচয়ে তার নাম সম্বলিত ছাপানো ব্যবস্থা পত্র

স্বর্ণকার জাহাঙ্গীর এখন সর্বরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার !

বিশেষ প্রতিবেদক ♦
বরগুনার বেতাগীর এসএসসি পাস স্বর্ণকার মো: জাহাঙ্গীর আলম এখন সর্বরোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হয়ে গেছেন। তিনি স্টোক, বিভিন্ন ব্যাথা, প্যারালাইসিস, মুখ বাকা থেকে শুরু করে জটিল সব রোগের চিকিৎসা করেন। তার কাছে একাধিক রোগী অপচিকিৎসার শিকার হয়ে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এমনই অভিযোগ আছে এই সর্বরোগ বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে।
স্ব ঘোষিত সর্বরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রোগীদের চিকিৎসা দিতে তার নাম সম্বলিত ছাপানো ব্যবস্থাপত্রে পরামর্শ ও ওষুধ সেবনের নিয়মাবলী লিখে স্বাক্ষর করে দেন। স্থানীয়দের বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে এ বছর ৪ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও প্রথম শ্রেনির ম্যাজিস্ট্রেট মো: রাজীব আহসান অভিযান চালায়। এসময় জাহাঙ্গীর আলম ডাক্তারী বিষয় কোথায় লেখাপড়া করেছেন জানতে চাইলে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম বলতে পারেনি। চিকিৎসা সংক্রান্ত সনদ দেখতে চাইলে সনদ রয়েছে বলে জানালেও কোন সনদ দেখাতে পারেন নি। তবুও মানবিক বিবেচনায় চেম্বার সাময়িক বন্ধ রেখে সনদ দেখানোর শর্তে তাকে ছাড় দেওয়া হয়। এক পর্যায় সনদ দেখালেও তা যথেষ্ঠ নয় বলে স্থানীয় প্রশাসন বরগুনা সিভিল সার্জনের অনুমতি সাপেক্ষে চিকিৎসা করার নিদের্শনা দেয় কিন্ত একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, অদৃশ্য শক্তিতে জাহাঙ্গীর আলম সেই নিদের্শনা মান্য করছে না।
সরেজমিনে পৌর শহরের সদর রোডের সাইনবোর্ড বিহীন জাহাঙ্গীর আলমের চেম্বারের সামনে গিয়ে দেখা যায়, অনেক রোগী অপেক্ষামান। তাদের কেউ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, প্যারালাইসিস, বাক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী সহ বিভিন্ন ধরনের রোগী। চেম্বারের ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। রোগীদের দেওয়া তার ব্যবস্থাপত্রে লেখা রয়েছে ডিপ্লোমা ইন মেডিসিন, প্যারামেডিকেল, ঢাকা-পরিচয়। খোজ নিয়ে যায় ব্যবস্থাপত্রে লেখা ডিগ্রির কোন কোন সনদ তার নাই। এ চেম্বারে বসে রোগী দেখলেও তার ব্যবস্থাপত্রে সদর রোডস্থ সেবা মেডিকেল সার্ভিসেস নামে ডায়াগনিস্ট সেন্টারে চেম্বার হিসেবে লেখা রয়েছে। তার পেছনের রহস্য অনুসন্ধান করে যতদুর জানা গেল, সেখানে তিনি বসেন না। ওই ডায়াগনিস্ট সেন্টারের কর্তৃপক্ষ জানান, নিজেকে জাহির করার জন্য ভুয়া নাম উল্লেখ করেছেন।
তিনি ২০১৪ সাল থেকে পৌর শহরে ও তার আশে-পাশের এলাকায় রোগীর চিকিৎসা করে আসছেন। প্রতিদিন বিভিন্ন রোগের ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী দেখেন। এর মধ্যে পারভীন (১৮) নামে এক রোগীর ব্যবস্থাপত্রে টাইফয়েট জ্বর, শ্বাসকস্ট, পেটে ব্যথা ও সাদাস্্রাব এসব রোগের জন্য ক্ল্যালভুসেফ, জেল-প্রো, ছিটিন, নিসপ্রো ও এফান এবং ইউনুস সিকদার (৬০) নামে রোগীর ব্যবস্থাপত্রে গাঁ ব্যথা, রক্তপড়া, গ্যাস্টিক আলসার ও বুক ব্যথার জন্য ফাইমোক্সিল, মেট্রিল, ইসোজ, মোটিগেট, মেলিক্সজল ও পিংকবিসমল এ ধরনের ঔষদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন রোগিকে স্টরয়েড জাতীয় ঔষদ দিয়ে থাকেন। এ ছাড়–ও তিনি বিভিন্নওষুধ কোম্পানীর বিক্রয় প্রতিনিধির নিকট থেকে প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা গ্রহন করেন ।
মো: জাহাঙ্গীর আলম অপচিকিৎসার বিষয় অভিযোগ অস্বীকার করেন বলেন, আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। চিকিৎসা করার মত প্রয়োজণীয় কাগজ পত্র রয়েছে বলেই রোগী দেখছি। জোর করে কারও কাছ থেকে টাকা নেই না, বরং যেটুকু পারছি মানুষের সেবা করে যাচ্ছি।
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: রাজীব আহসান জানান, অভিযান চালানোর সময় তিনি কোন সার্টিফিকেট দেখাতে পারেন নি। মানবিক কারনে তবুও সনদ দেখানোর শর্তে তাকে ছেরে দেই। পরবর্তীতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে সনদ দেখালেও চিকিৎসা করার মত উপযুক্তা নেই বলে তারা আমাকে অবহিত করছেন। তাই চেম্বার বন্ধ রেখে বরগুনা সিভিল সার্জনের অনুমতি সাপেক্ষে চিকিৎসা করার নিদের্শনা দেওয়া হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো: রবিউল ইসলাম জানান, তার কাছে যে ধরনের সনদ রয়েছে ওই সব সনদ দিয়ে কোনভাবেই রোগীর চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। রোগীদের মাঝে তার দেওয়া ছাপানো ব্যবস্থাপত্রে অভিজ্ঞতা হিসেবে ডিপ্লোমা ইন মেডিসিন, প্যারামেডিকেল, ঢাকা লেখা রয়েছে যা সম্পূর্ণ ভূয়া এবং উপাধি হিসেবে নামের আগে ডাক্তার লিখছেল তা তিনি কিছুতেই লিখতে পারেন না। তাছাড়া রোগীদের ক্ল্যালভুসেফ নামে যে ঔষধ দিয়েছেন তা বিশেষজ্ঞ কিংবা কোন মেডিকেল অফিসার ব্যতিরেকে রোগিকে দেওয়া সমিচীন নয়।
অভিযানকালে উপস্থিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা: শাহেদ মাহামুদ শাদী জানান, ওই সময় কোন সনদ উপস্থাপন করতে না পারায় পরবর্তীতে যে সনদ দেখিয়েছেন তা দিয়ে মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা করতে পারলেও সিভিল সার্জনের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে, কিন্ত এখনো তা তিনি দেখাতে পারেন নি। আমি জাহাঙ্গীর আলমের রোগী দেখা বিষয় নিয়ে বরগুনা সিভিল সার্জন মহোদয়ের সাথেও কথা বলেছি।
বরগুনা সিভিল সার্জন ডা. মো: জসিম উদ্দিন বলেন, এ ধরনের চিকিৎসা করার কোন এখতিয়ার নেই। জণগনের সাথে প্রতারনার শামিল। ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী।
এই সর্বরোগ বিশেষজ্ঞ মো: জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের উত্তর রানীপুর গ্রামে। বাবা আব্দুল মোতালেব ও মা আমেনা বেগমের ৫ ছেলে মেয়ের মধ্যে সে দ্বিতীয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি ঢাকায় স্বর্ণের দোকানে কাজ করতেন। এলাকায় আসার পর বর্তমানে যেখানে বসে রোগী দেখছেন ওই চেম্বারেই স্বর্ণের দোকান দিয়েছিলেন, কিন্ত ২০১৪ সালে হঠাৎ করেই এ মহৎ কাজে আর্ভিভাব হন। ১৯৯৪ সালে পুটিয়াখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসি পাস করেন।

Print Friendly

     এই ক্যাটাগরীর আরো খবর