,

বেতের ব্যবহার ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিখন ফল অর্জনের কৌশল

মোঃ জলিলুর রহমান 


অনেকের ধারনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বেতের ব্যাবহার অতীব জরুরি বিষয় । আসলে আজকাল অনেকে নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখানোর জন্য শিশুদের শারীরিক শাস্তি দিয়েও থাকেন। এতে ভালো ফলাফল আশা করা যায় না। যেহেতু শারীরিক শাস্তি বড় কঠিন। এ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না। শিশুদের মেরে শাসন করা কোনভাবেই ঠিক নয়। তাকে আদর করে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে ও বুঝিয়ে শেখানো উচিত।যেহেতু তারা কোমলমতি। তাদের ওপর এমন কোন আচরণ করা ঠিক নয়। সেহেতু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এ ধরনের শাস্তি শিশুর মেধা বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি  করে। সুতরাং তাদের সাথে ঐ রকম আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

একটি বিদ্যালয়ে শিশুর প্রতি আচরণে কৌশলী ও সহিষ্ণু হতে হবে। মারধর করে শিশুর কাছ থেকে তাত্ক্ষণিক সুফল পাওয়া হয়তো সম্ভব; কিন্তু এতে ক্ষতি হয়ে যেতে পারে দীর্ঘস্থায়ী। শিশুকে মেরে শেখানো অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়। বিশেষজ্ঞরা তো বলেছেন, এ ধরনের শাস্তি শিশুর মেধা বিকাশের পথে বাধাসৃষ্টি করে।

বাংলাদেশে প্রতি তিন জন মায়ের মধ্যে ১ জন মা বিশ্বাস করে, নিয়ম-কানুন শেখাতে সন্তানদের শারীরিক শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। তবে বড় কথা,  তাদের ভেতর ভবিষ্যতে অপরাধ করার প্রবণতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। শিক্ষা প্রদানের মূল বিষয় হচ্ছে মানসিকতার উন্নতি সাধন। আমরা আমাদের দেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং পারিবারিক পর্যায়ে ছোট শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য প্রহার করতে দেখি। এটা সভ্যতার সাথে বেমানান। আমাদের দাবি প্রতিটি শিক্ষক ও মাতা-পিতাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হয়ে শিক্ষাদান করতে হবে এবং স্কুলের ও মাদ্রাসার শিক্ষকদেরও ভালোবাসা ও আদর দিয়ে শিক্ষা প্রদান করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্মল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এক রায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধরনের শারীরিক শাস্তি অসাংবিধানিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে ঘোষণা করেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের কোনরকম শারীরিক শাস্তি অথবা নিষ্ঠুর, অমানবিক, অপমানকর আচরণ শিশু শিক্ষার্থীদের জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে। বিশেষ করে তা সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫ (৫) অনুচ্ছেদ ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি দেওয়ার ঘটনা উল্লেখজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।

শুধু আইন দিয়ে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনসচেতনতা। কেননা শারীরিক শাস্তি শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগে কোনও শিক্ষক আইন আদালতের মুখোমুখি হোক তা আমাদের কাম্য না।

এখন আসা যাক, কিভাবে কোন প্রকার শারীরিক ও মানসিক শাস্তি ছাড়া কি ভাবে শিখন শিখানো কার্যক্রম ফলপ্রসু করা যায় এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের প্রতি আমার পরামর্শঃ

১। শিক্ষক শিক্ষার্থীকে পাঠ গ্রহণে উপযোগী মানসিক ভাবে প্রস্তুত করবেন এবং পাঠের সময় সকলকে সক্রিয় রাখবেন।

২। শিক্ষার্থীকে শুধু পাঠ্যপুস্তকের নীরস পরিবেশে আবদ্ধ না রেখে সৃজনশীল ও বাস্তবতার সমন্বয় সাধন করবেন।

৩। শিক্ষাদান হবে উদ্দেশ্যমূলক। শিখন ফল অর্জনের দিকে লক্ষ্য রেখে বিষয় উপস্থাপনের পূর্বে শিক্ষক পাঠদানের প্রস্তুতি নিবেন। যাতে শ্রেণীর পরিবেশ স্বাচ্ছন্দ হয়, শিক্ষার্থীর পাঠ গ্রহণ হয় সুন্দর ও সার্থক ও ফলপ্রুসূ।

৪।শিখন শেখানো কার্যাবলীতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাবহার করতে হবে। যেমন মাল্টি মিডিয়া ও প্রোজেক্টরের ব্যাবহার করা যেতে পারে। প্রাক প্রাথমিক শ্রেণিতে ট্যাবের ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫। সব সময় পাঠ দান এ যেন চেনা পরিবেশের শব্দ ব্যবহার বেশি করতে হবে।

৬। বর্তমানে স্তর ভিত্তিক পাঠ দান একটি আকর্ষণীয় ও কার্যকর পদ্ধতি। এ পদ্ধতি ব্যাবহারে শ্রেণি পরিবেশ ভালো থাকে।

৭। শ্রেণি নেতা বা মনিটর ব্যাবস্থা কার্যকর রাখতে হবে। শ্রেনিতে গণতান্ত্রিক চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে।

৮। সুশৃঙ্খল, ধারাবাহিক ও মনোবিজ্ঞান সম্মত ভাবে পাঠ উপস্থাপন করার কৌশল প্রয়োগ করতে হবে।

৯। ছাত্র ছাত্রীদের মেধা ও আগ্রহ বিবেচনায় রেখে উপযুক্ত পদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহার করতে হবে।

১০। সময় অপচয় রোধ করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশ গ্রহন নিশ্চিত করতে হবে।

১১। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাময় মূলক ব্যবস্থা গ্রহন ও অগ্রগামী শিক্ষার্থীদের শিখনে

সহায়তা করা। এক্ষেত্রে শিক্ষককে কৌশলী ও নমনীয় হতে হবে।

১২। অর্থ না বুঝে মুখস্তকরন থেকে ছাত্র ছাত্রীদের বিরত রাখতে হবে।

১৩। নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ ও উপকরণ ব্যবহার বাড়াতে হবে। যথা যথ উপকরণ ব্যবহার

ও পাঠ পরিকল্পনা করে অংশ গ্রহন মুলক ক্লাস নিতে হবে। যাতে থাকবে কুশল বিনিময়, পূর্ব জ্ঞান যাচাই, পাঠ ঘোষণা, শিখন ফল জানানো,বোর্ডের কাজ, আলোচনা, দলিয়,একক কাজ, মূল্যায়ন, বাড়ির কাজ,বিদায়। প্রয়োজনে ICT পূর্ণ ব্যবহার করতে হবে।

১৪। বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধিতে প্রেষণা দান, অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ ও শ্রেণী কক্ষে সৌহার্দ্যপূর্ণ মানবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, সহ-পাঠক্রমিক কার্যক্রমের বিস্তার, বিদ্যালয়ে বাগান করা,ম্যাগাজিন প্রকাশ,সাহিত্য সংসদ গঠন ইত্যাদি কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে ।

১৫। মাঝে মাঝে চঞ্চল ছাত্র ছাত্রীদের কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করে হবে।এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক নিজে ও বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষক স্থায়ী কাঠামো করতে পারেন।

১৬। দলীয় কাজ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক তৈরি করতে হবে যাতে কোনো শিক্ষার্থীই পিছিয়ে না পড়ে।

১৭। উৎসাহব্যঞ্জক কাজ দিয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত রাখা, যাতে তারা দুষ্টুমি করার সুযোগ না পায়।

১৮। দুষ্ট শিক্ষার্থীর ভালো গুণের প্রশংসা করে তাকে ভালো হবার সুযোগ করে দিতে হবে।

১৯। শিক্ষার্থীদের চোখে চোখ রেখে পড়ানো, বোর্ডে লেখার সময়ও খেয়াল করা যেন কোনো শিক্ষার্থী অমনোযোগী বা দুষ্টামি করছে কিনা অর্থাৎ দৃঢ় মনিটরিং ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে।

২০ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে বা চারপাশে ঘুরে ঘুরে পড়াতে হবে।

২১। গল্পের মাধ্যমে উপদেশ-নির্দেশনা দান করতে হবে।

শিখন শেখানো কাজে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষা প্রক্রিয়া এবং শিক্ষার বিষয় – এ চারটি ক্ষেত্রের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে এক জন শিক্ষককে কাজ করতে হয়। তাই তাকে নিজ পেশার উপযোগী জ্ঞান, দক্ষতা এবং জ্ঞান অভিজ্ঞতা প্রয়োগের নিপুণতা অর্জন করতে হবে। তার কৌশলী আচরণই বেতের ব্যবহার (বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে) বন্ধ হতে পারে। পরিশেষে আমি বলতে চাই শিক্ষার্থীরা সকল প্রকার শাস্তিমুক্ত পরিবেশে শিখবে এ প্রত্যাশা সবার । শিশুরা অপরাধ করেনা, ভুল করে তাদের ভুল সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের প্রতিভা বিকাশ করতে একটি আনন্দঘন ও শিশু বান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে শিক্ষককেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

মোঃ জলিলুর রহমান এম এ (ইংরেজি), এল এল বি, বি এড প্রধান শিক্ষক, পূর্ব দপদপিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

Print Friendly

     এই ক্যাটাগরীর আরো খবর