,

শিশুদের প্রয়োজন আনন্দময় বিদ্যালয়

♦ লায়ন মো: শামীম সিকদার ♦
প্রতিটি শিশুই কামনা করে তাকে সবসচেয়ে বেশি আদর করা হোক। পিতামাতা সে ভ‚মিকা পালন না করলে ঘরের অন্য কারো সাহায্য সে নিবে। এ ক্ষেত্রে শিশুর শিক্ষায় পিতা-মাতার ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলের শিক্ষকদের যেকোন কাজ, কথা ও উপদেশ যদি বাসায় পিতামাতা অনুশীলন করতে পারেন তবে শিশু সে শিক্ষাকে স্বার্থকভাবে ধারন করতে পারে। কারন শিশু শিক্ষার্থীরা স্কুলের শিক্ষকদের সব কিছুকেই গুরুত্ব দেয়। শিশু শিক্ষার স্বার্থকতা আনয়নে শিক্ষক সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে শিখতে সহায়ক সবকিছু বাস্তবরূপে প্রদর্শন করবেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষক শিশুর প্রকৃত সমস্যা না জানার কারণে তার অগ্রগতি রিপোর্ট তৈরীতে কষ্ট হয়। তাই শিশুর সুষ্ঠু শিক্ষার জন্য স্কুল এবং পরিবারের সমান তথ্য নিতে হবে। শিশুর ব্যক্তিগত দিক সম্পর্কে তার কাজে অভিভাবকের নিকট সঠিক তথ্য জানা না থাকলে শিক্ষক অভিভাবক এর মাঝে ভুল বুঝাবুঝি হতে পারে।
সাধারণত তিন থেকে নয় বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের আমরা শিশু বলে থাকি। তবে আইনত ১৮ বছর হয়। একটি শিশুর মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। সকল শিশুই ঘরের বাইরে যেতে আগ্রহী। কারণ ঘরে নিয়মিত সে যা কিছু দেখে তার চেয়ে বাইরে বেশি দেখতে পায়। উপলদ্ধি করতে পারে। সে জন্য শিশু শিক্ষার পরিবেশ ও প্রতিষ্ঠান সৃজনশীল হতে হবে। যে কক্ষে শিশুকে পাঠদান করবেন সে কক্ষটিতে নানা ধরনের উপকরণ থাকতে হবে। শুধু বই নয় বাস্তুগত দিকে শ্রবন-দর্শন ফর্মূলা অনুযায়ী শ্রেণীকক্ষে দরজা জানালা আলো বাতাস থাকবে, বাইরে প্রশস্ত মাঠ সবুজের সমারোহ খেলাধুলা সামগ্রী ও উপযুক্ত স্নেহপূর্ণ মাতৃ-পিতৃতুল্য শিক্ষকের সাহচার্য, গাছ গাছালির উপস্থিতি শিশুকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। যেখানে শিশুর বাগানে শিক্ষক মালীর ভ‚মিকা পালন করে। প্রতিষ্ঠান প্রধানের চীফ গার্ডেনার।
১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ জার্মানীর উইসব্যাঙ্ক নামক গ্রামে ফ্রয়েবল জন্মগ্রহণ করেন। পনের বছর বয়সে তিনি বন বিভাগে চাকুরি গ্রহণ করেন। ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফাঙ্কফুজে একটি স্কুলে শিক্ষকতার কাজ গ্রহণ করেন। এই সময়ে তিনি পেস্টালৎসীর শিক্ষা পদ্ধতির সংস্পর্শে আসেন। তিনি শিক্ষাদর্শ বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগে ব্রতী হয়ে দেখেন যে ক্রটিপূর্ণ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ, পরে তিনি নিজস্ব দৃস্টিভঙ্গিতে শিক্ষা পদ্ধতির সংস্কার সাধন করেন। কিন্ডারগার্টেন পদ্ধতি এই চিন্তাধারারই ফলশ্র“তি। ১৮১৬ খ্রিষ্ট্রাব্দে তিনি কীলহাট গ্রামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এই স্কুলেই কিন্ডারগার্ডেন পদ্ধতির প্রস্তুতিপর সম্পন্ন হয়। শিশুরা এখানে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তাদের মধ্যে যে সম্ভাবনা রয়েছে তার প্রকাশ পেত। তার শিক্ষার লক্ষ্য ছিল শিশুর সুপ্ত শক্তির সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশ সাধন করা।
সুইজারল্যান্ড বার্গডর্ফে একটি অনাথ আশ্রম ও একটি শিক্ষক শিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনাকালে তিনি এই ব্যাপারে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। সুদীর্ঘ ত্রিশ বৎসরের অক্লান্ত সাধনায় তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। তিনি শিশু জীবনের ক্রমবিকাশের স্তর ও স্তরভেদে আত্মবিকাশের উপযোগী কতোগুলো খেলা ও কাজ আবিস্কার করেন। তিনি উপলদ্ধি করেন শিশুকে উপযুক্তভাবে গড়ে তুলতে হলে তার শিক্ষা তিন বৎসর বয়স হতে আরাম্ভ হওয়া উচিৎ। তাঁর মতে শিশুর আকৃতি, প্রকৃতি, শক্তি, সামর্থ্য, রুচি, অরুচি সবই আলাদা। শিশুর খেলা কর্মেরই অভিনয় মাত্র খেলাই শিশুর ধর্ম, কর্ম. সাধনা ও আরাধনা। তার শারীরিক, মানসিক, আবেগিক সকল প্রকার শক্তির পুঞ্জীভ‚ত সুষ্ঠু প্রকাশ এ খেলার মাধ্যমেই। তাঁর মতে শিশুকে কাদা মাটির সাথে তুলনা করা চলে।
কাদা মাটিকে যেমন ছাচেঁ গড়া হয়, উহা সেই আকৃতিরই হবে। শিশুর সামাজিক জীবন সুন্দর ও সুষ্ঠু হলে শিশুর ক্রমবর্ধমান গতি সহজ ও স্বাভাবিক হয়। এই ধারনার ভিত্তিতেই তিনি শিশু উদ্যান বলে অভিহিত করেন। ফ্রয়েবেলই হলেন প্রথম শিক্ষাবিদ যিনি শিশুর খেলায় শিক্ষামূলক গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। খেলাকে তিনি আত্মসক্রিয়তার অভিব্যাক্তি বলে বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া মানব অস্তিত্বের স্বার্থকতা হচ্ছে বিশ্বের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক একতাকে উপলব্ধি করা। এই আধ্যাত্মিক একতাকে উপলব্ধি করা এবং নিজের অন্তরস্থিত আত্মা বা সত্বাকে উপলব্ধি করা একই কথা। এই পরম আত্বোপলব্ধিই হচ্ছে শিক্ষা। তাই তিনি কিন্ডারগার্টেনে এমন সব খেলার উদ্ভাবন করেন এবং এমন সব খেলার সামগ্রীর প্রচলন করেন যে গুলো প্রতিকরূপে শিশুর কাছে বিশেষ অর্থবোধক হয়ে দাঁড়ায়। শিশুদের প্রথম থেকেই আল­াহর সাথে তাকওয়া এবং জীবনের প্রত্যেকটি কাজের জবাবদিহিতার অনুভ‚তির ধারনা দিতে হবে। শুরু থেকেই উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী অর্জনে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলার প্রচেস্টা চালাতে হবে। শিশু শিক্ষার একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিসীমা হলো তার পরিবার থেকে অর্জিত প্রশিক্ষণ। এ প্রশিক্ষণের অতি গুরুত্বপূর্ন দিক হলো শিশুদের মাতা-পিতার সাথে, বিশেষ করে মায়ের কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত শিশুদের কাজকর্ম এবং তাদের সঙ্গী-সাথীদের সম্পর্কে অবগত থাকা প্রয়োজন। শিশুদের সামনে ওদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষকমন্ডলী অথবা অপরাপর বন্ধু-বান্ধবের সমালোচনা করা যাবে না। ওদের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে। যাতে করে দেশ ও জাতি এবং মানবতা তাদের থেকে উপকৃত হতে পারে।
স্কুলে আসলে যে জ্ঞান অর্জন করা যায় সেই ধারনাটা শিশুদের আছে। অভিভাবকরা তাদের স্কুলে পাঠিয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকতে চান যে, তারা লেখা-পড়া শিখছে এবং মানসম্মতভাবেই শিখছে। যেসব বাবা-মা লেখাপড়া জানেন এবং সন্তানদের পড়াশুনার অগ্রগতি বুঝতে পারেন তাঁরা অনেক সময় স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করে শিশুদের প্রতি স্কুলের দায় বাড়িয়ে দেন। কিন্তু যাদের বাবা-মা শিক্ষিত নয় বা নিরক্ষর তারা তো আর স্কুলে গিয়ে নিজের সন্তানের অগ্রগতির হিসাব নিতে পারেন না। এই নিরক্ষর বাবা-মায়ের সন্তানরাই ভাগ্যবিড়ম্বিত অধিকাংশ শিক্ষার্থী যারা না বুঝে হলেও নিজের শিক্ষার দায় ভার নিজেরা বহন করে। শিশুদের মধ্যে যারা ভালো করেছে তাদের প্রতি শিক্ষকদের কিছুটা দৃষ্টি থাকলেও যারা পিছিয়ে পড়া স্বল্প- মেধাবী শিশু তারা শিক্ষকের কাছে অনেকটাই বাড়তি বোঝা। এই অক্ষমতার কারণে অপূর্ণ প্রাপ্তিকে শিশু অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কখনোই মেনে নেয়া যায় না, যারা আদিবাসী, প্রতিবন্ধী অথবা কর্মজীবী শিশু তাদের কাছে নিজের মনের ভাব ভালোভাবে বোঝাতে পারেনা এবং বাড়িতেও কারো সাহায্য পায় না। শিশুদের শেখার মাত্রা এবং বৌদ্ধিক পরিমান গ্রাম বা শহরের স্কুল ভেদে খুব যে একটা তারতম্য হয় তা মনে করার কারন নেই। প্রায় সব ক্ষেত্রেই শিক্ষাঙ্গন শ্রেণিতে একঘেয়ে পাঠদান কৌশল অবলম্বন করেন, শিক্ষার্থীরা পাঠ মুখস্থ করে আসে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করে এবং পরীক্ষায় গ্রহনযোগ্য একটা নম্বর পেলেই শিক্ষক, অভিভাবক এবং আত্মীয়- স্বজনরা খুশি হয়ে যান। গ্রামীন দরিদ্র পরিবারের শিশুশিক্ষার্থীদের ধারনা রাস্ট্রীয়ভাবে যেসব শিশুরা পুরস্কার পায়, যারা নাকী নামী দামী বিদ্যালয়ে সুযোগ পায়, তাদের স্কুলে ও বাড়িতে ভরা থাকে খেলা আর শেখার উপকরণ। যারা দরিদ্র নাগরিকের সন্তান, সরকারি বা বেসরকারি স্কুলে বিনা বেতনে এক ধরনের সংগ্রাম করে শিক্ষাগ্রহণ করতে প্রস্তুত, তারা কতোটা মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করতে পারছে তা যাচাই করার সাধ্য, তাদের পিতা-মাতা বা অভিভাবকদেও কারোরই নাই।
পৃথিবীর উন্নত দেশের শিশুরা যতোটা সময় স্কুলে থাকে আমাদের শিশুরা তার প্রায় অর্ধেক সময় স্কুলে থাকার সুযোগ পায়, তাও আবার কাগজে-কলমে। বাস্তবে শিক্ষকগণ ক্লাসে এসে যতোটা সময় পাঠদান করেন তার হিসাব করলে তাদের প্রাপ্তিটা আরো কমে যায়। যেসব বিষয়ের ক্লাসে নিয়মিতভাবে সম্পন্ন হয় তা হলো বাংলা, অংক আর ইংরেজী। বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় ক্লাস পায়ই অনিয়মিত এবং ক্লাশগুলো প্রায়ই থাকে দিনের শেষের দিকে যখন শিক্ষকেরা কেউ কেউ বাড়ি যাবার প্রস্ততি নেন। শিশুরাও কিছুটা ক্লান্ত এবং অমনোযোগী হয়ে ওঠে। এই বিষয়গুলো ছাড়া স্কুলে আরো কয়েকটি বিষয় আছে যা খুবই অনিয়মিতভাবে হয় যেমন ধর্ম, চিত্রাঙ্কন, গান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা অথবা খেলাধুলা বা পিটি। আমাদের শিশুদের বেশি আকর্ষন এই ক্লাশগুলির প্রতিই কিন্তু সেগুলি যদি স্যারেরা রা করান তবে শিশুরা আর কী বা করতে পারে! শিশু শিক্ষার্থীদের এই খেদ কি আমরা কোনদিন ঘোচাতে পারবো?
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়। শিশুর মানসিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য তাই উপযুক্ত একটা জায়গা দরকার, যেখানে শিক্ষকগণ পিতা-মাতার বিকল্প সেবা দেবে। আজকাল শহরে নানা ধরনের সিস্টেমে গড়ে ওঠেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সবগুলোই শিশুর জন্য উপযুক্ত নয়। পিতা-মাতাকে তাই ভর্তির পূর্বে উপযুক্ততা যাচাই করতে হবে। শিশুকে শুধু পাঠ্য বইয়ের শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যাবে না। কার্টিসি সহ বাস্তবজীবনের শিক্ষা দেয়া হয় যে প্রতিষ্ঠানে সেখানেই শিশু ভর্তি হবে। এক্ষেত্রে শিশু শিক্ষার জন্য শিক্ষকগণ ডাক্তার ও মনোবিজ্ঞানীর ভ‚মিকা পালন করছে কিনা তা লক্ষ্য রাখতে হবে। যে প্রতিষ্ঠানে শিশু তার মেধার সঠিক বিকাশ ঘটাতে পারে সেখানেই ভর্তি হবে। এর জন্য পিতামাতা যে সকল দিকে লক্ষ্য রাখবেন তা হলো কথাবলার ধরণ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, মানসিক ও সামাজিক পরিবেশ, আচরণগত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ, মূল্যবোধ শিক্ষা, অনুভূতি সম্বন্ধীয় শিক্ষা ইত্যাদি রয়েছে কিনা পড়াতে যতোটা সুশৃঙ্খল লাগে সেই পদ্ধতির প্রয়োগ দরকার তা আছে কিনা। বর্তমানে ছেলেমেয়েদের হাতে ভবিষ্যতের ভার ছেড়ে না দিয়ে আমাদের উচিৎ তাদের উন্নতির সোপান গড়তে সঠিক পথ নির্দেশনা দেয়া। আর এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আপনাকে সহযাত্রী হতে হবে। শিশুকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তিক করাতে হবে যেখানে থাকবে উপযুক্ত পরিবেশ, ব্যবসায়িক চিন্তা রেখে পাঠদান করাবে না, শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষার মাধ্যমে আলোকিত মানুষ গড়ে তার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষ আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার সাথে পালনের পাশাপাশি সহমর্মিতা দিয়ে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছাতে সহায়তা দেবে।
সামাজবিজ্ঞানীরা কমবেশি একমত যে, স্কুল হচ্ছে বৃহত্তর সমাজেরই ক্ষুদ্র মডেল মাত্র। অর্থাৎ স্কুল তার পরিবার ও সমাজের মধ্যে একটা সেতু হিসেবে কাজ করে। ভবিষ্যৎ সমাজের মধ্যে উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে তাকে গড়ে তোলা স্কুলের প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। ক্লাস শুরুর আগে অ্যাসেম্বলিতে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া, লাইন ধরে ক্লশে ঢুকে নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে বসা থেকে শুরু করে ক্লাস টেস্ট ও ফাইনাল পরিক্ষা পর্যন্ত যাবতীয় কর্মকান্ড স্কুলের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভূক্ত। সমাজ বিজ্ঞানীরা মনে করেন স্কুলে শিশুকে বিভিন্ন রকম বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়। এর ফলে বিচিত্র ব্যক্তিচরিত্র সম্পর্কে তার ধারনা গড়ে ওঠে। মানিয়ে চলার প্রবনতা তার মধ্যে তৈরি হয়। এছাড়া শিশুকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত স্কুলের নির্দিষ্ট আইন কানুনের মধ্যে থাকতে হয়। তো স্কুলের এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটা শিশু কার কাছ থেকে পায়? শিক্ষকই শ্রেনীকক্ষে তার উপস্থিতি, কথাবার্তা ও পড়ানোর পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুর মনে জীবনের মূল শিক্ষাগুলো গেঁথে দেন। এটাই শিক্ষকের আসল কাজ। অর্থাৎ স্কুলের শ্রেণিকক্ষ হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক ও চারিত্রিক বিকাশের প্রাণকেন্দ্র। অধিকাংশ ছেলে-মেয়েই তাদের স্কুলের পরিবেশকে উবসধহফরহম ধহফ ঈড়সঢ়বঃরঃরাব (উভয়ই নেতিবাচক অর্থে) বলে মন্তব্য করে। এ দু’টো শব্দের আক্ষরিক বাংলা করা মুশকিল, করলে আসল ভাবটা থাকবে না। উবসধহফরহম বলতে তারা যা বুঝিয়েছিল তা হলো, স্কুল তাদের কাছে সময় সাধ্যের অতিরিক্ত প্রত্যাশা করে তা সেটা পড়াশুনায় হোক কিংবা খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চায় হোক। অর্থাৎ আরো সহজ ভাষায় স্কুলের পরিবেশ তাদের প্রতি কমই সহানুভ‚তিশীল। ঈড়সঢ়বঃরঃরাব বলতে প্রতিযোগিতা মূলক বোঝানো হয়েছে, তবে এ প্রতিযোগিতায় সুস্থতার উপস্থিতি কম, ইদুর দৌড়ের মতন অন্যকে নির্দয়ভাবে ঠেলে ফেলে স্বার্থপরের মতো এগিয়ে চলতে থাকা। অর্থাৎ সহযোগিতা ও ভাগাভাগি করে নেয়ার শিক্ষাটা কমই পাচ্ছে তারা স্কুল থেকে, ইদুঁর দৌড়ের দীক্ষাই যেন আসল।
হোমওয়ার্ক তাদের মতে মাত্রাতিরিক্ত, সে সঙ্গে একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর । এর কারণ কী জানতে চাইলে অধিকাংশ ছেলেমেয়েই বলেছে, শিক্ষকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্লাসে ঠিকমতো পড়ান না, পাঠ্যবিষয় বুঝিয়ে দেন না। এক্ষেত্রে অনেক ইংরেজী ক্লাসের উদাহরণ টেনে আনলো। শিক্ষক ক্লাসে এলেন ধরা যাক, একটা গদ্য বের করে পড়ে শোনালেন, সামান্য কিছু ব্যাখ্যা-বর্ণনা দিলেন এবং সবশেষে গদ্যের নিচে সংযুক্ত অধ্যায়গুলি বাড়ি থেকে করে আনতে বললেন। কোন দিক নির্দেশনাও দিলেননা কীভাবে করতে হবে, শুধু বলে দিলেন, এটাই তোমাদের হোমওয়ার্ক, কালই দেখাতে হবে ইত্যাদি।
হোমওয়ার্ক ঠিকমতো করেনা নিয়ে গেলে ক্লাসে কী পরিস্থিতির সামনে পড়তে হয় তা সবাই খোলামনে বলেছে। এক কথায় শাস্তি। তবে শাস্তির সঙ্গে যোগ হয় লাঞ্ছনা। সহপাঠীদের সামনে লাঞ্ছিত হতে কেউই চায় না। শুধু মৃদু ধমকের ওপর দিয়ে যদি লাঞ্ছনার শেষ হতো, তাও কথা ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যা শুনতে হয় তা হলো অপমানজনক কূটবাজ, এমন সব অপ্রিয় কথা যা মর্মে গিয়ে আঘাত করে। মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছা করে। এসব তাদের মানসিক চাপকে শতগুণে পড়িয়ে দেয়।
মনে রাখতে হবে যে, শিশুর বয়স যেমন বাড়তে থাকবে তেমনী বাড়তে থাকবে তার সমাজ ও পরিবেশের পরিধি। শিশু প্রথমে থাকে শুধু তার পরিবারের সদস্য। স্কুলে গিয়ে হয় স্কুলের সদস্য। কদিন পরেই তাকে হতে হবে একটা বৃহত্তর সমাজের একজন পুর্ণাঙ্গ ও দায়িত্বশীল নাগরিক। সুতরাং এই শিশুকে ক্রমান্বয়ে সুনাগরিক করে গড়ে তুলতে হবে স্কুলের পটভ‚মিতে। কথা বলা একটা আর্ট। ঠিকমত বলতে ও লিখতে পারার জন্য দরকার উপযুক্ত অনুশীলনের। কথা বলা ও লেখার গুনে পড়াকেও একান্ত আপন করে নেয়া যায়। কথা বলার কৌশলগত তারতম্যের ফলে সমাজে ঘটে থাকে নানা কল্যান অকল্যান। সুতরাং শিক্ষার্থী যাতে তার বক্তব্য সঠিকভাবে প্রকাশ করার দক্ষতা অর্জন করতে পারে প্রাথমিক স্কুলেই সেদিকে বিশেষ যতœ নিতে হবে। শিশুর ব্যবহৃত ভাষায় সামাজিক আদব-কায়দা ফুটিয়ে তোলা দরকার প্রাথমিক স্তরে স্কুলগুলোকেই এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
শিশু শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পর্কে তার অভিভাবকের নিকট যথাযথভাবে তথ্য প্রেরন করা দারকার। সেক্ষেত্রে অভিভাবকের অঙ্গীকার ও সমর্থন আদায়ের জন্য শিশুর বিপর্যয় ও সুকৃতি উভয়ের অংশই তাদের দিতে হবে। শিশুর শিক্ষার মান বৃদ্ধিকল্পে পাঠ্য বইয়ের বাইরের কিছু শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করতে হবে। শিশু শিক্ষা পরিকল্পনামাফিক শুরু করতে হবে। শিশুদের মাঝে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সিদ্ধান্ত নিতে সন্তানকে সহযোগীতা করতে হবে। সন্তানকে প্রতিদিনই শর্তহীনভাবে ভালোবাসতে হবে। সন্তানের সাফল্য সেলিব্রট করুন। কাজের মূল্যায়ন পজিটিভলি করুন। সতর্কতা ও সাবধান বাণী গঠনমূলকভাবে দিন। ধৈর্য্য ধরতে উৎসাহিত করুন। সন্তানকে নয়, তার অমার্জিত কাজকে দোষী বলুন। মহৎ ব্যক্তিদের গল্প পড়ে শোনান, সন্তানের মধ্যে রসবোধ গড়ে তুলুন। অবশ্যই আত্মবিশ্বাসী বাবা-মা হোন। শিশু যেন ভাবে আমাদের স্কুল, আনন্দের এক রঙ্গিন ফুল। শিশুর মনে এ কথাটি সর্বপ্রথম সত্য বলে বদ্ধমূল করে দিতে হবে যে , এই দুনিয়াটা অল­াাহর সা¤্রাজ্য এবং তারই কুদরত ও শক্তিমত্ত¡ার বহিঃপ্রকাশ। এখানে মানবজাতি আল­াহর প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োজিত। আমাদের কাছে যা কিছু আছে তা সবই আল­াহর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে অর্পিত আমানত। আমানতের জন্য একদিন আমাদেরকে আল­াহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তবেই স্বার্থক হবে শিশুদের আনন্দময় বিদ্যালয়।

Print Friendly

     এই ক্যাটাগরীর আরো খবর