,

করোনার খাদ থেকে কিভাবে উঠবে গণমাধ্যম?

এডভোকেট মাওলানা রশীদ আহমদ ♣
কিনারে নয়, করোনা একেবারে খাদেই ফেলেছে দেশের গণমাধ্যমকে। জীবনের সঙ্গে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা গ্রাস করেছে সংবাদকর্মীদের। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইনসহ বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো এমন কঠিন সময়ে আর পড়েনি। এরইমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ঢাকার মূলধারার আট-নয়টি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশনা। আরো কয়েকটি বন্ধের পথে। কয়েকটি পত্রিকা প্রিন্ট সংস্করণ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
প্রকাশ হতে থাকাগুলোর বিক্রিও তলানীতে ঠেকেছে। পত্রিকার মাধ্যমে করোনা ছড়ায় এমন অহেতুক ভীতি পত্রিকার সার্কুলেশনে কিছুটা হলেও আঘাত হেনেছে। বিনোদনভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নতুন কোনো অনুষ্ঠান তৈরি করতে পারছে না। তারাও আক্রান্ত । নিউজ চ্যানেলগুলো নিয়মিত খবর সরবরাহ করছে। কিন্তু নিয়মিত কার্যক্রম ও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সচল না থাকায় তারাও সাবান আর হ্যান্ড স্যানিটাইজার ছাড়া কোনো বিজ্ঞাপন পাচ্ছে না।
করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন মালিকসহ সংবাদকর্মীদের অনেকে। মারাও গেছেন বেশ কয়েকজন। টেলিভিশনগুলোর অবস্থাও করুণ। সার্কুলেশনের সঙ্গে সংবাদপত্রের মার্কেটিং ভেঙে পড়েছে। টেলিভিশনগুলোরও তাই। বিজ্ঞাপনই সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের আয়ের বড় উৎস। বিজ্ঞাপন ও আয়ের পথ হারিয়ে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমগুলো আজ গভীর সংকটে পড়েছে। এমন করুণ পরিস্থিতি গণমাধ্যমের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। এ মাধ্যমের কর্মীরা কীভাবে চলছে-অনেকেরই জানার বাইরে।
বেশিরভাগ টেলিভিশনে বেতন-ভাতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাদি অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। ছাঁটাই তো আছেই। ছাঁটাইয়ের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কর্মীদের চলতি ও বকেয়া পাওনার সুরাহা করা হয়নি। রাজধানীর বাইরেও শত শত সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ প্রায়। এক তথ্যে জানা গেছে, করোনা পরিস্থিতিতে ঢাকাসহ দেশের আট বিভাগীয় শহর ও সংশ্লিষ্ট জেলায় ৮৬টি পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। অথচ সরকারের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর-ডিএফপির হিসাবে, এই আটটি বিভাগীয় শহর ও সংশ্লিষ্ট জেলা থেকে প্রকাশিত হওয়ার কথা ৩৪০টি পত্রিকা। সেই হিসাবে ২৫৪টি পত্রিকাই বন্ধ। গত মার্চে করোনা পরিস্থিতি শুরুর আগে ঢাকায় সংবাদপত্রের এজেন্ট ও হকারদের হাতে যেত ৫৫টি পত্রিকা। বাকি প্রায় ২০০ পত্রিকার নাম ডিএফপির মিডিয়া তালিকায় থাকলেও সেগুলো বিক্রি হতো না। বছরের পর বছর এগুলো দেয়াল বা আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা নামে পরিচিত। সেগুলোর বেশির ভাগ বন্ধ বলা চলে।
জীবনের ঝুঁকি ও বিড়ম্বনা নিয়ে তথ্য সরবরাহের দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করে যাচ্ছেন চাকরিরতরা। ভালো বেতন পাওয়া সংবাদকর্মীর সংখ্যা কম। সীমিত বেতন-ভাতা দিয়ে অনেক সাংবাদিক পরিবার পরিজন নিয়ে টানাপড়েনে দিন পার করেন। বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে বেশ ধকল সইতে হচ্ছে তাদের। সাংবাদিকদের কেউ কেউ গণমাধ্যমে মূল দায়িত্বে নিবেদিত থাকার বাইরেও একটু সচ্ছলতার আশায় টুকটাক নানা কাজে সম্পৃক্ত থাকেন। বর্তমানে তাও বন্ধ। করোনা পরিস্থিতি অন্য সকল ক্ষেত্রের মতো সাংবাদিকদেরও সীমাহীন দুর্দশা ও বিড়ম্বনা দিন দিন বাড়িয়ে তুলেছে। সংবাদপত্র শিল্পে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তা। তারওপর এই দুর্যোগেও কারণে-অকারণে মামলা, আটক, হয়রানির শিকার সাংবাদিকরা। চলছে নানান উপায়ে হয়রানি। সব মিলিয়ে মিডিয়ার জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে পড়ছে। অসহায় হয়ে পড়েছেন সাংবাদিকরা।
এ খাদ থেকে ওঠা বা ঘুরে দাঁড়ানোর পথ নিয়ে চিন্তিত সংশ্লিষ্টরা। সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মূল আয় বিজ্ঞাপন। করোনার মন্দার কারণে বিজ্ঞাপনের প্রবাহ কমে গেছে। পাশাপাশি বকেয়া বিলের প্রাপ্তিও অনিশ্চিত। তা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আর্থিক সংকটকে আরো তেজি করেছে। প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে চলমান রাখায় সংকট তৈরি হচ্ছে, কর্মীদেরও সংকট তৈরি হচ্ছে। সরকারি বিজ্ঞাপনও ‘নাই’ হবার দশায়। যেখানে পত্রিকাগুলো সরকারের কাছে ১৫০ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে, সেখানে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরকে মাত্র ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকারের সব সেক্টরে মিডিয়ার বিজ্ঞাপন বাবদ হাজার কোটি টাকা বকেয়ার অর্ধেক পরিশোধ করলেও গণমাধ্যমের জন্য সহায়ক হতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদের আগে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের ডেকে মিডিয়ার বকেয়া বিজ্ঞাপন পরিশোধের নির্দেশনা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। শুধু তথ্য মন্ত্রণালয় ছাড়া কেউই সাড়া দেয়নি।করোনা সংকটে বিভিন্ন খাত প্রণোদনা, সহায়তা বা ছাড় পেলেও সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম কিছু পায়নি। পাওয়ার ভরসাও নেই।
নানা মহল থেকে কিছু পরামর্শ এলেও ভরসা উঁকি দিচ্ছে না। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে কর্মরতদের দিকে রাষ্ট্রীয় মহল থেকে মানবিক হবার লক্ষণ এখনো নেই। এখন পর্যন্ত ঘোষিত প্রণোদনাগুলোর মধ্যে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ নেই। এ বছরের জাতীয় বাজেটে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবের একটি দাবিও মেনে নেওয়া হয়নি। চলমান এই সংকটের সহজ কোনো সমাধান নেই। সংবাদপত্র অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল শিল্প। অর্থনীতি সচল হলে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক হলে সংবাদপত্রশিল্প হয়তো ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে। তবে এটা কবে হবে, এ মুহূর্তে তা কারও পক্ষে বলা সম্ভব নয়। এই সংকটে সরকার গণমাধ্যমের জন্য কিছু করবে- সেটা আশা করার অবস্থা সেই। সরকারের কাছ থেকে বড় কোনো সহঅযথা মিলবে না, এটা ধরে নিয়েই টিকে থাকার চেষ্টা করতে হবে। সেই সক্ষমতা ক’জনের আছে?
বকেয়া বিল পরিশোধ করা, ঋণ দেওয়া, বিভিন্ন কর বা নিউজপ্রিন্টের শুল্ক কমানোসহ পরোক্ষ যেসব সহায়তা সরকার করতে পারত, সেগুলো আলোচনার টেবিলেই ঘুরছে। করোনার আগ থেকেই কমে গেছে সরকারি বিজ্ঞাপন। প্রায় বন্ধের উপক্রম বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্যের বিজ্ঞাপনও। এর মধ্যেই ব্যাংকের বিজ্ঞাপন বন্ধের ঘোষণাও এসেছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ওষুধশিল্পের বিজ্ঞাপন থাকলেও নেই বাংলাদেশে। বারবার অনুরোধ করেও পাওয়া যাচ্ছে না সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছে জমে থাকা বকেয়া বিল। ২০২০-২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সামনে রেখে সংবাদপত্রশিল্প রক্ষায় নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-নোয়াবের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঁচ দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
সেগুলো হলো সংবাদপত্রের করপোরেট ট্যাক্স ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা, নিউজ প্রিন্ট আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাদ দেওয়া, বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর উৎস কর (টিডিএস) ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা, উৎসস্থলে কাঁচামালের ওপর ৫ শতাংশের বদলে অগ্রিম কর (এআইটি) শূন্য শতাংশ করা এবং কর্মীর আয়কর থেকে প্রতিষ্ঠানকে দায়মুক্ত করা ও তাঁর বাড়িভাড়ার পুরোটাই করমুক্ত করা। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে এসব দাবির ব্যাপারে কোনো সুখবর পাওয়া যায়নি।
বিশ্বায়ন ও ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে ছাপা সংবাদপত্র এমনিতেই রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়েছে। আর করোনাভাইরাসের মহামারি সংবাদপত্রশিল্পের জন্য আরো ভয়াবহতা ডেকে এনেছে। পত্রিকাগুলোর মাসিক বেতন ব্যয়, অফিস ভাড়া, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, পত্রিকা পরিবহন ব্যয়সহ অন্যান্য সব ব্যয় অপরিবর্তিত রয়েছে।মহামারী ও দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রবাহ জরুরি। তাই সমাজের স্বার্থে, গণমানুষের স্বার্থেই গণমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এ সময়ে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে গণমাধ্যমকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলা কোনোভাবেই উচিত নয়। তথ্যে ঘাটতি-কমতি হলে গুজব বাড়বে। লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে, গণমাধ্যমের এ দুর্দিনে এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা মানুষের মুখে ঘুরতে থাকা অসংখ্য ‘ভুল বার্তা’ সমাজে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। তা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমই রাখছে। সংবাদপত্রে মুদ্রিত অক্ষর বা টিভিতে প্রচারিত তথ্য মানুষের নির্ভরতা বেশি। বিশ্বাসযোগ্যতায় পাঠক-দর্শকের মনে স্থান করে নেওয়া গণমাধ্যমই সরকার ও জনগণকে গুজব থেকে মুক্ত করছে। অথচ সেই গণমাধ্যমই এখন খাদে পড়ে গেছে। সংবাদপত্র বিক্রি কমে যাওয়ার জের পড়েছে হকারদের ওপর। ঢাকার সাত হাজার হকারের মধ্যে বর্তমানে বড় জোর ১৭-১৮শ জন টিকে রয়েছেন। যে হকার এক সময় প্রতিদিন তিনশ থেকে পাঁচশ পত্রিকা বিক্রি করতেন, তিনি এখন ৫০ থেকে ৬০টির বেশি বিক্রি করতে পারছেন না।
লেখকঃ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, গোলাপগঞ্জ-থবিয়ানীবাজার সংবাদ এর সম্পাদক ও প্রকাশক, কলামিস্ট, গবেষক, আইনজীবী।

Print Friendly

     এই ক্যাটাগরীর আরো খবর